মাত্র তিন মাস বয়সেই দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন নাটোরের সিংড়া উপজেলার পাপ্পু কুমার পাল। এরপর পাপ্পুর চিকিৎসার জন্য দেশ-বিদেশে বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে গিয়েছে তাঁর পরিবার। তবে পাপ্পু হারানো দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে পাননি।

ছয় বছর বয়সে পড়ালেখা শুরু করেন পাপ্পু। পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে পড়ালেখায় নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। তবে সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে মায়ের কাছ থেকে পড়া শুনে শুনে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন পাপ্পু। পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষক হতে চান তিনি।

 

পাপ্পু সিংড়া উপজেলার কলম গ্রামের বিমান কুমার পালের একমাত্র ছেলে। বিমান পাল সোনার গয়নার কারিগর। তিনি বলেন, জন্মের সময় থেকে পাপ্পুর চোখ দিয়ে সব সময় পানি পড়ত। ছোট বয়সেই তিনি অন্ধ হয়ে যান। পরে দেশের চিকিৎসকদের পাশাপাশি ভারত ও নেপালে গিয়েও ছেলের চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু তেমন কোনো লাভ হয়নি। তবে চিকিৎসকেরা পাপ্পুর পরিবারকে জানিয়েছেন, যেকোনো সময় পাপ্পুর দৃষ্টি ফিরে আসতে পারে। সেই অপেক্ষায় আছে তারা।

পড়াশোনার ক্ষেত্রে পাপ্পুর সঙ্গী তাঁর মা ভারতী রানী পাল। তিনি বই পড়ে শোনান, ছেলে তা শুনে মুখস্থ করেন। ভারতী বলেন, জুয়েলারির কাজ করে তাঁদের সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশায় চিকিৎসার জন্য সব সম্পত্তি শেষ হয়ে গেছে। তবে পাপ্পুর পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সে জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। সর্বশেষ এইচএসসি পরীক্ষায়ও পাপ্পু মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে পাপ্পুর জন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের ব্যবহারের উপযোগী কম্পিউটার দরকার। সেটা কিনে দেওয়ার সাধ্য তাঁদের নেই।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাপ্পু পাঁচ বছর বয়সে মা-বাবার হাত ধরে কিন্ডারগার্টেনে যাতায়াত শুরু করেন। শ্রেণিশিক্ষকের কথা শুনে পড়ার ধারণা নিতেন। আর বাড়িতে এসে মায়ের কাছে পড়তে বসতেন। পরীক্ষার সময় শ্রুতলেখক পাপ্পুর বদলে পরীক্ষার খাতায় লিখতেন। এভাবে প্রথম শ্রেণি পাস করেন তিনি।

তবে স্থানীয় ওই স্কুল কর্তৃপক্ষ পাপ্পুকে এভাবে পড়াতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে পাপ্পুকে রাজশাহী শহরের একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তি করানো হয়। সেখানে তিনি ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলায় পাপ্পু আবার বাড়িতে ফিরে আসেন। এরপর তিনি ভর্তি হন সিংড়ার দত্তগোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে কলম উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ওই বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে ভর্তি হন কলম ডিগ্রি কলেজে। এইচএসসিতে সাফল্যের পর পাপ্পু সিংড়া গোল-ই আফরোজ সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছেন।

 

পাপ্পু বলেন, ‘আমার বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে পারব না, এ জন্য মানবিকে পড়ছি। সবকিছু চিন্তা করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছি। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে একই বিষয়ে শিক্ষকতা করতে চাই।’ তিনি বলেন, তাঁর এত দূর আসার পেছনে পরিবারের পাশাপাশি তাঁর শিক্ষক আজাহার মিয়া, বিমল চন্দ্র পাল ও সরবেশ আলীর বিশেষ অবদান আছে। এ ছাড়া পাপ্পু শ্রুতলেখক পূজা রানী পালের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

কলম ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক সরবেশ আলী বলেন, ‘পাপ্পু বুদ্ধিমান ছেলে। আমি ক্লাসে যা পড়াতাম, সেগুলো পাপ্পু মনোযোগ দিয়ে শুনত, আর রেকর্ড করে নিত। কখনোই সে ক্লাস ফাঁকি দিত না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.